মা-বাবাকে সালাতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার মার্জিত ও কার্যকর কৌশল
ব্যক্তিগতভাবে নামাজ আদায়ের পাশাপাশি নিজ পরিবারের সদস্যদেরও ইবাদতের পথে ডাকার বিষয়ে পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আল্লাহ তাআলা সুরা ত্বহার ১৩২ নম্বর আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘আর তুমি তোমার পরিবারকে নামাজের নির্দেশ দাও এবং তার ওপর অবিচল থাকো।’ তবে ছোট ভাইবোন কিংবা সন্তানদের খুব সহজে নামাজের তাগিদ দেওয়া গেলেও জন্মদাতা পিতা-মাতাকে এই বিষয়ে বলা অত্যন্ত স্পর্শকাতর একটি বিষয়। ইসলামে পিতামাতার মর্যাদা সবার ওপরে রাখা হয়েছে। এ কারণে তাঁদের কোনো ভুল শুধরে দেওয়া কিংবা ভালো কাজের পরামর্শ দেওয়ার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদব ও প্রজ্ঞার পরিচয় দেওয়া প্রতিটি সন্তানের দায়িত্ব। মা-বাবাকে নামাজের প্রতি আহ্বান করার কিছু সুন্দর ও ফলপ্রসূ পদ্ধতি রয়েছে।
পিতা-মাতাকে নামাজের কথা বলার ক্ষেত্রে সন্তানের বাচনভঙ্গি ও আচরণ হতে হবে অত্যন্ত বিনম্র। তাঁদের ওপর কোনো অবস্থাতেই অভিভাবকত্ব বা শিক্ষকের ভাব প্রদর্শন করা যাবে না। সুরা বনি ইসরাইলের ২৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর তাদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো।’ নবী ইব্রাহিম (আ.) যখন তাঁর পিতা আজরকে ইমান ও সালাতের দাওয়াত দিয়েছিলেন, তখন তিনি অত্যন্ত মিষ্টভাষায় বারবার ‘হে আমার প্রিয় পিতা’ বলে সম্বোধন করতেন, যা সুরা মারইয়ামের ৪২ থেকে ৪৫ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। ইমাম কুরতুবি তাঁর ‘আল-জামি লি–আহকামিল কুরআন’ (১১ত/৯৫, দারুল কুতুব আল-মিসরিয়্যাহ, কায়রো, ১৯৬৪) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মা-বাবাকে কোনো সৎকাজের নির্দেশ কিংবা অসৎকাজ থেকে বারণের ক্ষেত্রে সন্তানের ভাষা হতে হবে অত্যন্ত বিনম্র; তাঁদের প্রতি কোনো রূঢ় আচরণ বা তিরস্কার করা চলবে না। তাঁরা যদি আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেন বা ক্ষোভ প্রকাশ করেন, তবুও সন্তানকে চুপ থেকে পূর্ণ সম্মান বজায় রাখতে হবে।
মানুষ মুখের উপদেশের চেয়ে বাস্তব কাজের মাধ্যমেই বেশি উদ্বুদ্ধ হয়। সন্তান নিয়মিত সালাত আদায়ের ফলে যদি নিজের মধ্যে ইতিবাচক রূপান্তর আনে এবং বাবা-মায়ের খেদমতে আরও আন্তরিক হয়, তবে তাঁরা উপলব্ধি করবেন যে নামাজই তাঁদের সন্তানকে এমন মানবিক করে তুলেছে। মুসনাদে আহমদের ৮৯৫২ নম্বর হাদিসে মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্রই হলো শ্রেষ্ঠ নেক আমল।’ সদাচরণ হলো সবচেয়ে বড় নীরব আহ্বান। পাশাপাশি ঘরে একটি চমৎকার দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তোলা যায়। সরাসরি বললে কখনো কখনো তাঁদের আত্মমর্যাদায় লাগতে পারে, তাই আজান শুনে উচ্চকণ্ঠে আজানের উত্তর দেওয়া কিংবা কোরআন তিলাওয়াত করার মতো কৌশল বেছে নেওয়া যেতে পারে। জায়নামাজে বসে সন্তানের অশ্রুসিক্ত মোনাজাত প্রত্যক্ষ করলেও বাবা-মায়ের হৃদয় নরম হতে পারে। এছাড়া কৌশল হিসেবে বলা যায়, ‘মা, ফজরের সময় আমাকে একটু ডেকে দিয়ো।’ এতে তাঁদের নিজেদের মাঝেও ওয়াক্তের ব্যাপারে একধরনের তাগিদ তৈরি হয়।
কারও হৃদয়ে হেদায়েত দান করা কেবলই আল্লাহর এখতিয়ার। প্রিয় চাচা আবু তালিবের ক্ষেত্রেও স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সা.) হেদায়েত দেওয়ার সুযোগ পাননি। তাই মা-বাবার জন্য শেষরাতে রবের দরবারে কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করা জরুরি। সুরা ইব্রাহিমের ৪০ নম্বর আয়াতে একটি অনন্য দোয়া শেখানো হয়েছে, ‘হে আমার প্রতিপালক, আমাকে নামাজ কায়েমকারী বানান এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।’ এ প্রসঙ্গে ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়া তাঁর ‘মাদারিজুস সালিকিন’ (১/২৩৫, দারুল কিতাব আল-আরাবি, বৈরুত, ১৯৯৬) গ্রন্থে লিখেছেন, মানুষের হৃদয়সমূহ আল্লাহর আঙুলগুলোর মাঝে অবস্থান করে; ফলে প্রকাশ্য প্রচেষ্টার চেয়ে রজনীর শেষভাগে আল্লাহর কাছে করা প্রার্থনা অন্তরে সবচেয়ে দ্রুত এবং অলৌকিক পরিবর্তন এনে দেয়।
মা-বাবাকে একবার কিংবা দুবার বলেই আশা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। কোনো কারণে তাঁরা বিরক্তি প্রকাশ করলে বা বকা দিলে কোনো অবস্থাতেই বিতর্কে জড়ানো যাবে না। কুফর বা শিরকের আদেশ ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে তাঁদের অনুগত থাকার তাগিদ রয়েছে এবং কোনো অবস্থাতেই দুর্ব্যবহারের সুযোগ নেই। সুরা লুকমানের ১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘আর যদি তারা তোমাকে আমার সঙ্গে এমন কিছু শরিক করতে পীড়াপীড়ি করে, যার কোনো জ্ঞান তোমার নেই, তবে তুমি তাদের কথা মেনো না; কিন্তু দুনিয়াতে তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে বসবাস করো।’ মূলত মা-বাবাকে নামাজের পথে আনার চেষ্টা একটি ধৈর্যশীল ও ভালোবাসাপূর্ণ অভিযাত্রা। কোনো ধরনের জোরজবরদস্তি না করে অকৃত্রিম মমতা, একনিষ্ঠ সেবা এবং অবিরাম দোয়ার মাধ্যমেই তাঁদের মনকে নামাজের প্রতি আকৃষ্ট করা সম্ভব।





আপনার মতামত লিখুন